দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র তান্ডবে লোনা জল আর ধূলিঝড়ে যখন তছনছ সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা আশাশুনির প্রকৃতি, ঠিক তখনই সবুজ বিপ্লবের এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করল স্থানীয় শিশু-কিশোররা। কারো মুখে বিরক্তি নেই, কারো হাতে নেই ক্লান্তি, ছোট ছোট হাতে কোদাল আর চারা গাছ নিয়ে জলবায়ু অভিঘাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তারা বদলে দিচ্ছে নিজেদের ভবিষ্যৎ। আশাশুনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাকিব নুর জানায়, বৃক্ষহীন, রুক্ষ পরিবেশকে সবুজে ছেয়ে ফেলতে একযোগে রোপণ করা হয়েছে ৫ হাজার ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ।
একই স্কুলের ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাকিব আনোয়ার জানায়, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় আশাশুনি উপজেলা চত্বরে মহতী এই আয়োজন এটি স্রেফ কোনো প্রথাগত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়; বরং জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবন বাঁচানোর এক বলিষ্ঠ প্রতিরোধ।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামনানন্দ কুন্ডুু সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, উপকূলের লোনা পানি আর উষ্ণায়নের যে গতি, তাতে আমরা যদি এখনই রুখে না দাঁড়াই, তবে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে আশাশুনি এক মানবহীন মরুভূমিতে পরিণত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত থেকে এই উপকূলকে রক্ষা করার শেষ অস্ত্র হলো বৃক্ষরোপণ। আন্তর্জাতিক মহল কবে অনুদান দেবে আর জলবায়ু তহবিল আসবে- সেই আশায় বসে থাকার সময় আর আমাদের হাতে নেই।
তিনি আরও যোগ করেন, আজ আমাদের এই শিশু-কিশোররা যে ৫ হাজার চারা রোপণ করল, তা কেবল কিছু গাছের সংখ্যা নয়- এটি আশাশুনিকে বাঁচিয়ে রাখার এক জীবন্ত অঙ্গীকার। উপকূলকে মরুভূমিকরণ, অক্সিজেনের ঘাটতি এবং তীব্র লবণাক্ততার হাত থেকে রক্ষা করতে এই শিশুরা আজ আমাদের বড়দের চোখ খুলে দিয়েছে। প্রশাসন থেকে এই শিশু যোদ্ধাদের প্রতিটি উদ্যোগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও স্থায়ী সুরক্ষার আওতায় আনা হবে।
উদ্যোগী শিক্ষার্থী আনন বলছিল, আমরা প্রতিদিন দেখছি কীভাবে গাছ হারিয়ে আমাদের এলাকাটা মরুভূমির মতো হয়ে যাচ্ছে। বাতাসে অক্সিজেন কম, মাটিতে লবণের তীব্রতা। বিশ্বনেতারা জলবায়ু তহবিল দেবেন আর আমরা বসে বসে সেই ফান্ডের দিকে তাকিয়ে থাকব সেই দিন আর নেই। নিজেদের রক্ষা করার লড়াই আমাদের নিজেদেরই শুরু করতে হবে। এই ৫ হাজার গাছ কেবল কাঠ বা ফল দেবে না, এগুলো আমাদের আশাশুনির ভবিষ্যৎ রক্ষা করবে।
আরেক শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম এভাবে যোগ করেন, গাছ না থাকলে এই অঞ্চলে লোনা পানি আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, আশাশুনি একসময় পুরোপুরি বাসযোগ্যতা হারাবে। উষ্ণতা যে হারে বাড়ছে, তাতে আগামীতে এখানে টিকে থাকাই কঠিন হবে। তাই আমরা আমাদের আগামী দিনগুলোকে নিরাপদ করতেই মাঠে নেমেছি।
উপকূলের এই খুদে যোদ্ধাদের হাতকে শক্তিশালী করতে নেপথ্যে থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা জুগিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও। সংগঠনটির প্রকল্প প্রধান শামসুল হক মৃধা বলেন, আমরা সাধারণত বড় বড় পলিসি আর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কথা শুনি। কিন্তু জলবায়ু অর্থায়নের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চেয়ে শিশু-কিশোরদের এই ৫ হাজার গাছ রোপণের প্রভাব অনেক বেশি বাস্তব ও কার্যকরী। বৈশ্বিক ক্ষতিপূরণের আশায় হাত গুটিয়ে না বসে স্থানীয় পর্যায়ে এভাবেই অভিযোজন নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে পূর্ণ সংহতি জানিয়েছে পুরো আশাশুনিবাসী। স্থানীয় আশাশুনি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাঝহারুল ইসলাম মুকুল বলেন, শ্রেণিকক্ষের বইয়ের পাঠকে এরা বাস্তবে রূপ দিয়েছে। গাছ না থাকলে যে অক্সিজেনের ঘাটতি হবে, মরুভূমিকরণ বাড়বে এবং লোনা পানির দাপটে কৃষিজমি চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে-এই সত্যটি আমাদের শিক্ষার্থীরা পুরো দেশকে বুঝিয়ে দিল। ওদের এই উদ্যোগ আমাদের বুকটা গর্বে ভরিয়ে দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে সংহতি জানিয়ে জলবায়ু যোদ্ধা ও ক্লাইমেট জাস্টিস ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক সাংবাদিক আমিনা বিলকিস ময়না বলেন, জলবায়ু বিচারে বিশ্বজুড়ে নানা তাত্ত্বিক আলোচনা চলছে। কিন্তু এই উপকূলীয় শিশুরা দেখিয়ে দিল আসল 'ক্লাইমেট অ্যাকশন' কাকে বলে। লোনা পরিবেশ ও চরম উষ্ণতার বিরুদ্ধে তাদের রোপণ করা এই ৫ হাজার গাছ প্রতিটি পাতায় পাতায় এক একটি আশার বার্তা লিখছে। বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে যেখানে কথা বেশি কাজ কম, সেখানে আশাশুনির এই খুদে শিশুরা বিশ্ববাসীর চোখ খুলে দেওয়ার মতো শিক্ষা দিল।
শিক্ষক নারায়ন পাল বলেন, জলবায়ু সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশের উপকূল থেকে শিশুরা যে সাহসিকতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে, তা কেবল জাতীয় ভাবে নয়, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার টেবিলেও একটি দৃষ্টান্তমূলক আর বিষয়ভিত্তিক গবেষণা বা ঘটনা বিশে¬ষণ হয়ে থাকার দাবি রাখে।
কেএম